ইসলামে মেয়ের উত্তরাধিকার — মূল কথা

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝি হয় এই বিষয়টি নিয়েই। অনেকে মনে করেন মেয়েরা বাবার সম্পত্তি পায় না, বা পেলেও সামান্য পায়। বাস্তবে পবিত্র কোরআনে মেয়ের অংশ সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত — এবং তা কেউ কমাতে বা বাতিল করতে পারে না।

মেয়ে ফারায়েজের ভাষায় জাবিল ফুরুজ — অর্থাৎ যাঁদের অংশ কোরআনে নির্দিষ্ট করা আছে। কিন্তু একটি বিশেষ নিয়ম আছে: ভাই উপস্থিত থাকলে মেয়ে তাঁর নির্দিষ্ট অংশ ছেড়ে আসাবা বা অবশিষ্টভোগী হয়ে যান, এবং ভাইয়ের সাথে ২:১ অনুপাতে ভাগ করেন।

তিনটি অবস্থা — কখন কত পাবেন

  • এক মেয়ে, কোনো ছেলে নেই: মেয়ে পাবেন সম্পত্তির ১/২ অংশ (৫০%)।
  • দুই বা তার বেশি মেয়ে, কোনো ছেলে নেই: সব মেয়ে একসাথে ২/৩ অংশ (৬৬.৬৭%) পাবেন এবং নিজেদের মধ্যে সমান ভাগ করবেন। দুই মেয়ে হলেও ২/৩, পাঁচ মেয়ে হলেও ২/৩।
  • ছেলে আছে: মেয়ের আর নির্দিষ্ট অংশ থাকে না। অন্য ওয়ারিশদের অংশ বাদ দেওয়ার পর যা থাকে, তা ছেলে-মেয়ে ২ : ১ অনুপাতে ভাগ করবেন।

লক্ষ করুন, উপরের অংশগুলো পুরো সম্পত্তির নয়। প্রথমে স্বামী/স্ত্রী, পিতা, মাতা প্রমুখের নির্দিষ্ট অংশ বাদ যায় — তার সাথে মিলিয়েই মেয়ের অংশ চূড়ান্ত হয়। কখনো কখনো সবার অংশ যোগ করলে ১০০%-এর বেশি হয়ে যায়, তখন আউল নীতিতে সবার অংশ আনুপাতিক হারে কমে; আবার কম হলে রদ নীতিতে বেড়ে যায়।

এখানে মেয়ে ১/২ অংশ পাচ্ছেন কারণ তাঁর কোনো ভাই নেই। স্ত্রী ১/৮, আর বাবা-মা প্রত্যেকে নির্দিষ্ট ১/৬ করে পাচ্ছেন। এই সব মিলিয়ে হয় ২৩/২৪ — অর্থাৎ ১/২৪ অংশ অবশিষ্ট থাকে। সেই অবশিষ্টটুকু পিতা আসাবা হিসেবে নিয়ে নেন, তাই তাঁর মোট অংশ দাঁড়ায় ৫/২৪ বা ২০.৮৩%। পিতার এই দ্বৈত ভূমিকা — নির্দিষ্ট অংশ ও অবশিষ্টভোগী দুটোই — অনেকের চোখ এড়িয়ে যায়।

ভাই থাকায় এখানে মেয়েরা আর ২/৩ পাচ্ছেন না। স্ত্রীর ১/৮ বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্ট ৭/৮ অংশ ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে ২ : ১ : ১ অনুপাতে ভাগ হয়েছে।

যদি শুধু মেয়েরাই থাকেন

অনেকে ভাবেন ছেলে না থাকলে বাকি সম্পত্তি চাচা বা ভাইয়েরা নিয়ে যাবেন। এটি সবসময় সত্য নয়। কোনো আসাবা (অবশিষ্টভোগী) না থাকলে অবশিষ্ট অংশ রদ নীতিতে মেয়েদের কাছেই ফিরে আসে।

মেয়েরা প্রথমে ২/৩ পেতেন এবং স্বামী ১/৪। যোগফল ১০০%-এর কম, আর অবশিষ্ট নেওয়ার মতো কোনো আসাবা নেই। তাই স্বামীর অংশ অপরিবর্তিত রেখে অবশিষ্টটুকু মেয়েদের ভাগে যোগ হয়েছে — মেয়েরা মোট ৭৫% পাচ্ছেন।

যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি হয়

  • "মেয়ে বিয়ে হয়ে গেলে আর পাবে না" — সম্পূর্ণ ভুল। বিবাহিত হোক বা অবিবাহিত, মেয়ের অংশ একই থাকে।
  • "দুই মেয়ে হলে প্রত্যেকে ১/২ করে পাবে" — না। দুই বা তার বেশি মেয়ে মিলে ২/৩ পাবেন, প্রত্যেকে আলাদা নয়।
  • "বাবা জীবিত অবস্থায় লিখে না দিলে মেয়ে বঞ্চিত" — উত্তরাধিকার আপনাআপনি কার্যকর হয়, আলাদা করে লিখে দিতে হয় না।
  • "মেয়েকে সামান্য কিছু দিয়ে বিদায় করা যায়" — মেয়েকে তাঁর প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত করা শরীয়াহ ও দেশের আইন — দুই দিক থেকেই অন্যায়।

আপনার নিজের পরিবারের হিসাব করুন

ওয়ারিশদের নাম ও সম্পদের পরিমাণ দিন — মুহূর্তেই পাবেন বিস্তারিত বণ্টন তালিকা, হিসাবের ধাপ এবং প্রিন্টযোগ্য রিপোর্ট।

ফ্রি ক্যালকুলেটর খুলুন →

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

না। ইসলামী উত্তরাধিকার আইনে ভাই ও বোন একসাথে থাকলে ভাই বোনের দ্বিগুণ পান (২ : ১)। তবে ছেলে না থাকলে মেয়ে একা ১/২ বা মেয়েরা মিলে ২/৩ পান, যা অনেক ক্ষেত্রেই বড় অংশ।
উত্তরাধিকার হিসেবে বঞ্চিত করা যায় না। তবে জীবিত অবস্থায় দান বা হেবা করলে সেটি ভিন্ন বিষয় — সেক্ষেত্রেও সব সন্তানের মধ্যে ইনসাফ করা ইসলামের নির্দেশ। এ ধরনের বিষয়ে একজন আলেম ও আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
প্রথমে অন্য নির্দিষ্ট অংশধারীরা (স্বামী/স্ত্রী, পিতা, মাতা) পাবেন। এরপর অবশিষ্ট থাকলে তা আসাবা — যেমন পিতা, দাদা, ভাই বা চাচা — পাবেন। কেউ না থাকলে রদ নীতিতে অবশিষ্ট অংশ মেয়েদের কাছেই ফিরে আসে।
বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ৪ ধারা অনুযায়ী, যে সন্তান দাদার আগেই মারা গেছেন তাঁর সন্তানেরা প্রতিনিধিত্ব নীতিতে অংশ পান।

সম্পর্কিত লেখা

বি.দ্র. এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য। প্রতিটি পরিবারের অবস্থা আলাদা এবং ছোট একটি তথ্যেও ফলাফল বদলে যেতে পারে। চূড়ান্ত বণ্টনের আগে একজন বিজ্ঞ আলেম ও অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিন।